মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যারা বলছে ‘সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’, তারা নিজের স্বার্থে কথা বলছে—এসব মানুষের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে বিএনপি আগামী পাঁচ বছর দেশের দায়িত্ব পাবে এবং জনগণের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ করবে। “জনগণ বিএনপিকে পাঁচ বছরের সময় দিয়েছে,” তিনি জানান। এ প্রসঙ্গে যারা বিরোধিতা করছে, তারা জনগণের স্বার্থে কথা বলছে না—তারা নিজেদের স্বার্থে কথা বলছে; তাদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকা দরকার।
অনুষ্ঠানে তিনি অতীত রাজনৈতিক ঘটনাসমূহের কথাও স্মরণ করান। তিনি প্রশ্ন করেন—১৯৭১ ও ১৯৮৬ সালের আন্দোলনে সেই রাজনৈতিক দলটি কোথায় ছিল? এক যুগ ধরে চলা আন্দোলনে তাদের উপস্থিতি নেই বলেই উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া, শহীদ ও নিপীড়িতদের তালিকা করলে দেখা যাবে বহু মারা, গুম ও নির্যাতিত মানুষই ছিল বিএনপির কর্মী—এমনও দাবি করেন তিনি।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে ম্যান্ডেট দিয়েছেগেছে—এ কথাও আবার বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানুষ বলেছে ‘তোমরা দেশ গড়ে তুলো, আগামী পাঁচ বছর সময় দিলাম’। স্বৈরাচার уходানোর কথাও বলে তিনি উল্লেখ করেন যে, জনগণই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশকে স্বৈরাচ্য মুক্ত করেছে এবং দেশের ভবিষ্যত গড়ার দায়িত্বও জনগণের হাতে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শ্রীমঙ্গল থেকে বিকেল ৩টার দিকে মৌলভীবাজারে পৌঁছান। অনুষ্ঠানে তিনি জেলার প্রান্তিক ও বাস্তুচ্যুত নারীদের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন—বিশেষভাবে ১০ জন নারীকে হাতে কার্ড তুলে দেন। একই সঙ্গে তিনি কম্পিউটারে একটি বাটন চাপিয়ে মৌলভীবাজারের ১৯ ওয়ার্ডসহ অনলাইনের মাধ্যমে আরও ২১ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তৃতীয় পর্যায়ে নারীদের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের আগে তিনি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে একটি আম ও একটি নিম গাছের চারা রোপণ করেন; এর আগে শ্রীমঙ্গলে ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জাম ও কৃষ্চূড়া গাছের চারা রোপণ করেন।
মৌলভীবাজারের ওই অনুষ্ঠানে সরকার চা-মজুরদের জন্য আবাসন, তাদের সন্তানদের জন্য বৃত্তি ও দুঃস্থ-অসহায়, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক মানুষদের জন্য এককালীন আর্থিক অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী।
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি পুনরায় সতর্ক করে বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতিগুলোই জনগণের পরিকল্পনা—যারা এসব ভেস্তে দিতে চায় তাদের সম্পর্কে জনগণকে সচেতন থাকতে হবে। “বিএনপির কিছু করা লাগবে না, জনগণ সতর্ক থাকলেই এসব কাজ হয়ে যাবে,” তিনি বলেন। দেশটির মালিক নাগরিকরাই—তাই মালিক যদি সচেতন থাকে তাহলে কারও টেনশন থাকবে না। দেশের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ জনগণের হাতে তিনি সঁপে দিয়েছেন বলে জানান।
কোথা থেকে তহবিল আসবে—এ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছি বলে যারা প্রশ্ন করে তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত এক যুগে দেশের অর্থপাচারের যে চিত্র ছিল তা সারা পৃথিবী দেখেছে; এখন থেকে সেই পাচার রোধ করা হবে। “এই দেশের মানুষের অর্থ দেশে থাকবে, দেশের মানুষের জন্য ব্যবহার হবে”—এটাই তাদের কাছে জবাব। তিনি সবাইকে মানুষের জন্য ভাবা এবং কাজ করার আহ্বান জানান, তখন উপায় বের হবে।
আগামী সময়ে দেশের কাজ ও উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, সামনে সময়টা কাজ করার, দেশ গড়ার এবং দেশের ভাগ্য বদলের। দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত যদি অলস থাকলে কিছুই করা সম্ভব হবে না—সবাইকে সক্রিয় থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের স্মরণে বলেন, এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় উন্নয়ন হয়নি—গত এক যুগে এখানে কাজ হয়নি বলেও উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে সমাজ কল্যাণ ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারহানা শারমিন, জাতীয় সংসদের হুইপ জে কে গউস, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম. নাসের রহমান এবং কেরানিগঞ্জ থেকে অনলাইনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
প্রধানমন্ত্রী শেষ করেন উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে একতা ও জনকল্যাণ কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিজ্ঞায়—ভবিষ্যতে সব কর্মপরিকল্পনা দেশ ও মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে গড়বে বলে তিনি আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষকদের ঋণ মওকুফ (১০ হাজার পর্যন্ত), মুয়াজ্জিন-ইমামদের সম্মানী, স্কুল শিক্ষার্থীদের ড্রেস ও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ইত্যাদি কাজ শুরু করা হয়েছে; এসব সুবিধা দলমত নির্বিশেষে সবার জন্য থাকছে।
মৌলভীবাজারের সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী বিকাল সাড়ে ৫টায় সিলেটের উদ্দেশে সড়কভাবে রওনা হন।




