আন্তর্জাতিক সংবাদ Freedom সূচকে বাংলাদেশ ২০২৬ সালে তিন ধাপ পিছিয়ে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম অবস্থান অর্জন করেছে—এমন তথ্য দিয়েছে প্যারিসভিত্তিক রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ)। বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে ওই সংগঠন সতর্ক করে।
আরএসএফ প্রতিবছর ১৮০টি দেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে সূচক প্রকাশ করে। এই সূচকে গণমাধ্যমের পরিস্থিতিকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’ থেকে ‘ভালো’—মোট পাঁচটি স্তরে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। ২০২৬ সালের তালিকায় বাংলাদেশের র্যাংকিং ছিল ১৫২তম; এক বছর আগের (২০২৫) অবস্থান ছিল ১৪৯তম—অর্থাৎ এক বছরে তিন ধাপের অবনতি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সূচকের অবনতি কেছেন কয়েকটি কারণে—আইনি চাপ, সম্পাদনায় স্ব-সেন্সরশিপ, মালিকানার কেন্দ্রীকরণ, এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে সাংবাদিকতা করার পরিবেশ অবনতিশীল হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের প্রায় ১৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি দারিদ্রসীমার নিচে বাস করেন; তাদের বড় অংশের কাছে মূলধারার গণমাধ্যমে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত। তবুও ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংবাদ-তথ্যের প্রবাহ বাড়ছে।
গণমাধ্যমের অবস্থা নিয়ে আরএসএফ বলেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান দুই সংবাদমাধ্যম—বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতার—সম্পাদকীয় স্বাধীনতা হারিয়ে সরকারি প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বাসসের পরিস্থিতিও একই রকম।
বেসরকারি খাতে রয়েছে হাজারের বেশি সংবাদপত্র, কয়েকটি টিভি ও রেডিও চ্যানেল এবং শতাধিক অনলাইন নিউজপোর্টাল; তবু মালিকানা কয়েক বড় ব্যবসায়ীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় সংবাদমাধ্যমকে প্রভাব ও মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। আরএসএফ টেনে ধরে বলেছে, এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্যোগ থাকে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা—ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্ষুণœ হয় এবং ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বাড়ে।
আইনি কাঠামোর দিক থেকে প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে, বিতর্কিত ডিজিটাল আইন উদাহরণ হয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো বিধান সাংবাদিকদের ওপর দমনমূলক প্রভাব বিস্তার করে। এই আইন অনুসারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্র warrants ছাড়া তল্লাশি, গ্রেফতার ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দের সুযোগ পান এবং সোর্সের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা বাড়ে। এসব পরিস্থিতিতে সম্পাদকরা প্রায়ই স্বভাবতই নিজেরাই নিজ প্রতিবেদন কাটছাঁট করতে বাধ্য হন।
নিরাপত্তা ও হামলার প্রসঙ্গে আরএসএফ জানিয়েছে, গত এক দশকে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর হামলায় অনেক সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন; এছাড়া অনলাইনেও ধর্মভিত্তিক হুমকি ও হয়রানি বেড়েছে। রাজনৈতিক মাটির বৈপরীত্য ও পরিবর্তনের সময়ে দুই শতাধিক সাংবাদিক ভিত্তিহীন মামলার শিকার হয়েছেন এবং অন্তত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে—রিপোর্টে এসব ঘটনারও উল্লেখ আছে।
লিঙ্গভিত্তিক অসুবিধাও চিহ্নিত হয়েছে: সাংবাদিকতা এখনো পুরুষ-প্রাধান্যশীল পেশা হিসেবে রয়ে গেছে; নারী সাংবাদিকেরা কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও অনলাইনে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণার শিকার হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ARSF দেখায়, এবারই প্রথম বিশ্বজুড়ে অর্ধেকের বেশি দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ‘কঠিন’ বা ‘খুবই উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে রয়েছে। সূচকের শীর্ষে মাত্র সাতটি দেশ আছে—নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস ও এস্তোনিয়া এগুলোর মধ্যে। ফ্রান্স ‘সন্তোষজনক’ অবস্থানে ২৫তম আছে; যুক্তরাষ্ট্র ৬৪তম, যেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর অবস্থান সাত ধাপ নেমেছে বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।
আরএসএফের সম্পাদকীয় পরিচালক অ্যান বোকান্দে বলেন, তথ্যের অধিকার ও সাংবাদিকতার ওপর আক্রমণ এখন অনেকভাবে ও সূক্ষ্মভাবে হচ্ছে। তিনি বলেন এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ করতে গণতান্ত্রিক সরকার ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় হওয়া দরকার; বিশেষত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অপ্রতিবেদকদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি তুলেছেন।
সংগঠনটি সতর্ক করেছে, বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ১১০টিতে (৬০ শতাংশের বেশি) সংবাদকর্মীদের বিভিন্নভাবে অপরাধী ভাবা হচ্ছে এবং জরুরি অবস্থা বা আইন প্রয়োগের অপব্যবহার করে তাদেরকে নিশানা করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, তথ্য বাধা আর সুশাসনের অভাবের কারণে গণমাধ্যম স্বাধীনতার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে—যেমন গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও লেবানন এলাকায় সাংবাদিকরা হামলার সম্মুখীন হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরএসএফের আহ্বান হলো: তথ্যের অধিকার রক্ষায় বেশি স্বচ্ছতা, সাংবাদিক নিরাপত্তা ও স্বাধীন সংবাদ পরিবেশ নিশ্চিত করা—না হলে গণতান্ত্রিক গণমাধ্যম ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েই যাবে।




