ঢাকা | বুধবার | ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক খাতে রূপান্তরে সরকারের বহুমুখী পরিকল্পনা

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য আনানো ও জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার একটি সমন্বিত ‘স্মার্ট কৃষি’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এই মহাপরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে গত ১৪ এপ্রিল সরকার ‘কৃষক কার্ড’ উদ্বোধন করেছে, যার মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি দশ ধরনের সেবা পাবে।

আজ বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আউয়ালের একটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমির সংকোচন ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাসহ নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলা করে কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক খাতে রূপান্তরই সরকারের লক্ষ্য, এজন্যই কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে।

কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রদানযোগ্য দশটি সেবার মধ্যে রয়েছে: ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, ফসল বীমা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়, কৃষি সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য প্রদান এবং ফসলরোগ-শত্রু দমন সংক্রান্ত পরামর্শ। সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষকের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সরকারি অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উন্নত ও উচ্চফলনশীল বীজ ও সুষম সার ব্যবহার সম্প্রসারণ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি দিয়ে ট্রাক্টর, হারভেস্টার, রিপারসহ যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করা। মাটির গভীরতাকে কাজে লাগিয়ে জলব্যবস্থার উন্নয়নে ইতোমধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পতিত জমি চাষে ফিরিয়ে আনার জন্য ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু করে প্রতিটি অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হচ্ছে, ফলে জমির ব্যবহার সর্বাধিক সম্ভব হবে। খাল খনন ও ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে বহু পতিত জমি কৃষিযোগ্য করা হচ্ছে; সিলেট ও চরাঞ্চলে বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে এ কাজ ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।

কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণেও সরকারের গুরুত্ব বাড়ছে—চালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা ও ফুলের চাষ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের জন্য ভর্তুকি, স্বল্প সুদের ঋণ ও ফসল বীমা কার্যক্রমকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে কৃষক কার্ড ব্যবহৃত হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনকেও বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

সরকারের বরাদ্দ ও সহায়তা বিষয়েও সংসদে তথ্য দেওয়া হয়: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্য থেকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ বিতরণের জন্য ৪০১ কোটি ৬০ লাখ টাকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা থেকে প্রায় ২৫ লক্ষ ২২ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হয়েছেন।

ফসল সংরক্ষণ ও বিপণনের সুবিধার জন্য আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ, মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হচ্ছে। রপ্তানির সুযোগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল ও ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা চালু রয়েছে।

কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব বৃদ্ধি করে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো—যেমন: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)—অধিক ফলনশীল, রোগ-প্রতিরোধী ও স্বল্পমেয়াদি জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে। বিশেষভাবে জলবায়ু সহনশীল জাতের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে পরিবর্তিত পরিবেশেও উৎপাদন বজায় রাখা যায়।

অবশেষে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে ‘ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে আছে লবণাক্ত, খরা ও বন্যা সহনশীল ফসল চাষ, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, কম সেচে উৎপাদন সম্ভব করা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে টেকসই পদ্ধতি গ্রহণ, সেচ ব্যবস্থায় Alternate Wetting and Drying (AWD) প্রবর্তন, প্রি-পেইড মিটার স্থাপন এবং মোবাইল অ্যাপ—যেমন ‘খামারি অ্যাপস’—মাধ্যমে স্থানভিত্তিক আবহাওয়া ও বাজার তথ্য ও চাষ পরামর্শ প্রদান। পাশাপাশি প্রিসিশন এগ্রিকালচারসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিকে আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের দাবি, এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন ও আয় বাড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দ্রুত পৌঁছাবে এবং কৃষি খাত আরও টেকসই ও লাভজনক হবে।