ঢাকা | শনিবার | ২৫শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১১ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

কাতারের রাস লাফানে আঘাত: বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান সবচেয়ে ঝুঁকিতে

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত সংঘাতের জেরে কাতারের প্রধান এলএনজি কেন্দ্র রাস লাফান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় স্থানীয় ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় বিঘ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনগুলো বলছে, গত বুধবার ইসরায়েল ইরানের পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়। জবাবে ইরান পারস্পরিক উত্তেজনা চক্করে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে বলে খবর আসে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ১২ ঘণ্টারও কম সময়ে ইরান কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে দুবার আঘাত হানে; ফলে সেখানে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে বলে স্বাধীনভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

রাস লাফান কাতার এনার্জি পরিচালিত একটি বিশাল এলএনজি‑প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র। এখানে গ্যাস সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, তরলীকরণ ও বন্দর সুবিধা সবই এক জায়গায় রয়েছে। কাতার বিশ্বের এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি করে, আর ওই রপ্তানির বড় অংশই রাস লাফান থেকে যায়। তাই এই কেন্দ্রে আঘাত লাগলে সরবরাহে তাত্ক্ষণিক ভিন্নতা ছড়ানো ছাড়া উপায় নেই।

আরও জটিলতা যোগ করেছে হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন অবস্থা—মার্চের শুরু থেকে ওই অঞ্চলে নৌপথ কার্যত সীমিত হয়ে গেলে এলএনজি ও অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন ও রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এখন কেন্দ্রগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি থাকায় কার্যক্রম পুরোদমে চালু করতে সময় লাগতে পারে, যা সরবরাহ‑শৃঙ্খলে দীর্ঘমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করবে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো—বিশেষত বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান—এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। এ দেশগুলোর এলএনজি আমদানি‑চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি কাতার থেকে আসে এবং মজুত সীমিত; তাই সরবরাহে বিঘ্ন হলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সেক্টরে তাত্ক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে। আরও অনেক দেশ—এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশগুলোও কাতার থেকে সরবরাহ পেয়ে থাকে, ফলে তারা ও বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য হবে।

রাস লাফানে এলএনজির বাইরে সার উৎপাদন (ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া), সালফার এবং হিলিয়ামও করা হয়। হিলিয়াম মাইক্রোচিপ নির্মাণ ও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তি খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাতার এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় এক চতুর্থাংশ হিলিয়াম সরবরাহের সক্ষমতা এই কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করে—তাই এখানে সমস্যা হলে কেবল জ্বালানি নয়, অন্যান্য শিল্পকাজেও প্রভাব পড়বে।

ভৌগোলিকভাবে রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি কাতার উপদ্বীপের উত্তর-পূর্ব কোণে, রাজধানী দোহা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এটি পার্স উপসাগরের বিশাল গ্যাসক্ষেত্র থেকেই গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করে—বহু সময় কাতার ও ইরান মিলে ওই ক্ষেত্র ভাগাভাগি করে থাকে; কাতার অংশকে বলা হয় নর্থ ডোম এবং ইরান অংশকে সাউথ পার্স।

অতএব, বর্তমানে রাস লাফানে চালানো হামলার প্রভাব শুধু স্থানীয় নয়—গ্লোবাল জ্বালানি বাজার, কৃষি সার সরবরাহ ও উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পেও চেইন‑প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি উন্নত বা স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববাজারে বাড়তি অনিশ্চয়তা বজায় থাকবে।