ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় তেলের দাম দুই বছরে সর্বোচ্চ, বিশ্ব অর্থনীতিতে সতর্কতা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছেন যে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রফতানিকারক দেশগুলো কয়েক দিনের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে—এমনকি সাময়িক বন্ধই বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে দুর্দশার দিকে ঠেলে দিতে পারে। গতকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৯%-এর বেশি বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল আনুমানিক ৯৩ ডলারে পৌঁছিয়েছে—এটি ২০২৩ সালের শরতের পর থেকে সর্বোচ্চ স্তর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে, হিটিং ও বিদ্যুৎ খরচ বাড়বে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যও তীব্রভাবে রেকর্ড বাড়বে। সংক্ষিপ্ত মেয়াদে এইসব প্রভাব সরাসরি দুর্বল আয়ের মানুষদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে।

কাতার এনার্জি জানিয়েছে যে তাদের একটি এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র সামরিক হামলার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। সাদ আল-কাবি আরও বলেন, ‘‘যদি যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।’’ তিনি আশঙ্কা করেন যে দামের এমন উত্থান বিশ্বজুড়ে উৎপাদন বন্ধ এবং সরবরাহ চেইনে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ডেকে আনবে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হার্মুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত সপ্তাহে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই সংকীর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো—যারা ওই রুটের ওপর নির্ভরশীল—ভারের সংকটের সম্মুখীন হতে পারে।

রাইস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক হোর্হে লিওন এই পরিস্থিতিকে ‘‘বাস্তব ঝুঁকি’’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘‘আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে স্পষ্ট নয় এটি সাময়িক সংকট নাকি একটি বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শুরু। যদি সরবরাহ ব্যবস্থা দুই সপ্তাহের বেশি বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।’’

যুক্তরাজ্যের বাজার তদারকি সংস্থা সিএমএ এবং জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেম পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ভোক্তা ও ব্যবসার খরচ বাড়াবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে কয়েক সপ্তাহের তেল মজুদ থাকলেও তা শাসিত সাময়িক সমাধান; যদি মজুদ ফুরিয়ে যায় এবং উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকে, তখন বাজার সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। পরিস্থিতি প্রশমনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের জরুরি তেল মজুদ বাজারে ছাড়ার কথা বিবেচনা করতে পারে—যা আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দেখা গেছে।

সংক্ষিপ্তভাবে—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানির নিরাপত্তার উপর সরাসরি ছায়া ফেলেছে। দ্রুত বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা না হলে ভোক্তা-মূল্য ও উৎপাদন খরচে প্রসারিত চাপ বিশ্বজুড়ে অনুভূত হবে।