পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম দুপুরে এই কাজের উদ্বোধন করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সচেতন সিদ্ধান্তের ফলে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে — 이제 বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল এবং ধাপে ধাপে hereের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেনসহ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।
রি-অ্যাক্টরে জ্বালানি লোডিং ও পরবর্তী পরিকল্পনা:
রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের রি-অ্যাক্টরই হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র। এখানে ইউরেনিয়াম ভিত্তিক জ্বালানি লোড করা হবে এবং নিউক্লিয়ার ফিশন বা নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন করে তা থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রি-অ্যাক্টর কোরে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করতে হবে, যা সম্পূর্ণ করার জন্য আনুমানিক ৩০ দিন সময় লাগবে।
জ্বালানি লোডিং শেষ হওয়ার পর শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ—এখানে নিয়ন্ত্রিতভাবে নিউক্লিয়ার ফিশন রিয়্যাকশন ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে, যার জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৪ দিন সময় নির্ধারিত আছে। সফল পরীক্ষার পর রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে ধাপে ধাপে ৩%, ৫%, ১০%, ২০%, ৩০% ইত্যাদি পর্যায়ে উন্নীত করা হবে; এ পর্যায়গুলো সম্পন্ন করতে আনুমানিক ৪০ দিন লাগতে পারে। রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার মাত্রা ৩ শতাংশে উঠলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। সব মিলিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ পেতে প্রায় ১০ মাস সময় ধরা হয়েছে।
জীবনকাল ও জ্বালানি কড়া:
রূপপুর কেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ু নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬০ বছর, প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা আছে। একবার জ্বালানি লোড করলে সেটি প্রায় দেড় বছর ধরে চলবে; এরপর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী প্রথম তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া, ফলে শুরুতে জ্বালানি আমদানির ঝামেলা থাকবে না। এরপর বাংলাদেশ নিজেই প্রয়োজনমতো ইউরেনিয়াম আমদানি করে দুই বছরে একবার বদলাপত্র করবে।
কেন্দ্রের সক্ষমতা ও লাভ-জনিত প্রভাব:
রূপপুর কেন্দ্রের দুটি ইউনিট মিলিয়ে মোট উৎপাদনক্ষমতা ২৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটেই এইটুকু জ্বালানি লোডিং করা হচ্ছে; দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণও তৎপরতাসহ চলছে। পুরো কেন্দ্র চালু হলে এটি শিল্প, কৃষি ও শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহে নতুন গতি আনবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মজবুত করবে।
নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি:
রূপপুরে ব্যবহৃত রি-অ্যাক্টর তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি—এটি ডিজাইন করা হয়েছে যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতেও স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। জ্বালানি লোডিং ও স্টার্টআপের প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা ও কড়া মনিটরিংয়ের অধীনে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
ইতিহাস ও প্রস্তুতি:
পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বাংলাদেশের প্রাথমিক ভাবনা এসেছিল ষাটের দশকে; ১৯৬২ সালে সম্ভাব্য স্থানের মধ্যে পাবনার রূপপুর নির্বাচিত হয়। যদিও ১৯৭৭ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণে স্থবির ছিল, তবুও এর ফলাফল ভবিষ্যৎ নীতিমালার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৮৬ সালে সাভারে ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার গবেষণা রি-অ্যাক্টর চালু করে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে রূপপুর প্রকল্পে আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি হয়, আর ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রসাটমের মধ্যে নির্মাণ ও জ্বালানি সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়।
জ্বালানি দক্ষতা ও পরিবেশগত সুবিধা:
পারমাণবিক বিদ্যুতের জ্বালানি দক্ষতা অত্যন্ত বেশি। উদাহরণস্বরূপ, এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন কয়লা প্রয়োজন হয়; একই ক্ষমতার পারমাণবিক কেন্দ্র বছরে মাত্র প্রায় ২৭ টন পারমাণবিক জ্বালানি প্রয়োজন। রূপপুরের দুই ইউনিট থেকে বার্ষিক উৎপাদিত বিদ্যুৎ আনুমানিক ৪০০ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাসের সমমান। পরিবেশ সংরক্ষণের দিক থেকেও পারমাণবিক বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ: রূপপুর কেন্দ্র কয়লা-নির্ভর কেন্দ্রের তুলনায় বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন এবং গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় প্রায় ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিতর্ক থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তির বেশি ব্যবহারকে পরিচ্ছন্ন ও কম কার্বনযুক্ত জ্বালানি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
রূপপুর প্রকল্প সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে এবং দেশি-বিদেশি অংশগ্রহণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান মেনে এর বাস্তবায়ন চলছে। এখন যে ধাপে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছিল—বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম ধাপের সূচনা—তাই আশাপ্রকাশ করা হচ্ছে এটি দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনবে।




