ঢাকা | সোমবার | ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

এশিয়ায় নিজেদের বলয় হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, মিত্ররা ঝুঁকছে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির দিকে

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে জ্বালানি তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশ নতুন বিকল্প খুঁজে নেওয়ার জন্য বাধ্য হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইন রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে তাদের তেল ক্রয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা আগে খুবই সীমিত ছিল। গত বছর পর্যন্ত এশিয়ার পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো রাশিয়া থেকে তেল কেনা এড়াতে এবং ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত খুবই সামান্য পর্যায়ে। তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে হামলা চালানোর ফলে এই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে যে ধাক্কা লেগেছে, তাতে অনেক এশীয় দেশই জেনে গেছে তাদের জন্য বিকল্প খুঁজে নেওয়া জরুরি। মস্কো ও তেহরানের সঙ্গে বৈঠক বা আলোচনা এখন তাদের অন্যতম মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার একজন বিশেষ দূত পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া জাহাজগুলো নিয়ে আলোচনা করতে ইরানিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একইদিনে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো মস্কোতে যান রাশিয়ার সঙ্গে তেল কেনাকাটা নিয়ে আলোচনা করতে। উল্লেখ্য, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে বেশির ভাগ তেল এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে গন্তব্যস্থল হিসেবে পাঠানো হতো, যার প্রায় ৮০ শতাংশই এশিয়ায় পৌঁছাত। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে suddenly তেলের অভাব দেখা দিয়েছে, ফলে ফিলিপাইনসহ অনেক দেশই এখন নতুন উৎস খুঁজছে। এর মধ্যে অনেক দেশই এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অনিশ্চয়তার মাঝে রুশ তেলের দাম এখন বাজারের গড় দাম থেকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি বেশি হলেও, দরকারের তেল কিনে রাখার জন্য অনেকেই বিকল্প অঙ্গীকারে জড়িয়ে পড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়া যেমন দেশের তেল মজুত রাখতে রাশিয়া থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ন্যাপথা আমদানি করে। ২০২৩ সালের মার্চে দেশটি রাশিয়া থেকে ২৭,৯০০ টন ন্যাপথা আমদানির অনুমোদন দিয়েছিল। এই পরিস্থিতি দেশগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বোধ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, জাপান এই পরিস্থিতিতে বেশ হাসিঠাট্টার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বেশ কয়েক বছর ধরে এই দুই দেশের সঙ্গে তেল সরবরাহের সম্পর্ক ছিল, কিন্তু ২০১৫ সালে ইরানের পারমাণবিক চুক্তিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে জাপান স্বল্পমূল্যে ইরানের কাছ থেকে তেল ক্রয় বন্ধ করে দেয়। তবে সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ও বন্দি জাপানি নাগরিককে মুক্তি দেওয়ার জন্য। অন্যদিকে, মার্কিন চাপের কারণেই জাপান ও কিছু অন্যান্য দেশ ইরানের ওপর থেকে নিজেদের অবদান প্রত্যাহার করলেও, বিদ্রোহকারী ধাক্কাই কমিয়ে আনতে কিছু দেশ রাশিয়া ও ইরান থেকে সরাসরি তেল সংগ্রহের পথ বেছে নিচ্ছে। ফিলিপাইন তাদের দেশের অন্যতম পুরোনো মিত্র, যেখানে তেলের অভাব এতটাই প্রকট যে দেশের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়। সেই সঙ্গে তারা রাশিয়া, কানাডা ও ভারতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর দেশটি এখন খুব শক্তিশালী কৌশল অবলম্বন করছে। উত্তর কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ রাশিয়া থেকে তেল ক্রয়ে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে রাশিয়া থেকে তেল সংগ্রহে শিথিলতা দেখা দিলেও, এই তেল এখন বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ নিজের তেল মজুতের জন্য কঠিন পর্যায়ের পদক্ষেপ নিচ্ছে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া রাশিয়া থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল আমদানি করেছে, যা সুপারিশকৃত। জাপান, অর্থাৎ এই অঞ্চলের বৃহৎ দেশটি, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে রেখেই তার আড়ালে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যাতে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের অস্থিত্ব বজায় থাকে। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর ফোনকলে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনাও এরই অংশ। বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোও এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে, ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে বাড়ছে তার দাম। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।