ঢাকা | বুধবার | ২২শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৮ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

গুম ও হেফাজতে খুন নিয়ে নির্মিত ‘সতলুজ’ ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে সরানো—তীব্র বিতর্ক

ভারতের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভ থেকে পাঞ্জাবের বিতর্কিত চলচ্চিত্র ‘সতলুজ’ পাকিস্তানীয় ক্যাটালগ নয়—ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে সরিয়ে দেয়া হলো, যা মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। ছবিটি জশবন্ত সিং খালরা নামক এক শিখ মানবাধিকারকর্মীর জীবনীভিত্তিক তদন্ত ও লড়াইকে নিয়ে নির্মিত; প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক দিলজিৎ দোসাঞ্জ।

ছবিটি আকস্মিকভাবে প্ল্যাটফর্ম থেকে উঠিয়ে নেয়াকে দিলজিৎ দোসাঞ্জ নিজেই তীব্রভাবে নিন্দা করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছেন, “আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না।” এক সাক্ষাৎকারে তিনি ছবিটিকে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম অর্থবহ কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, জশবন্ত সিং খালরার আত্মত্যাগ ও মানবতা-প্রতি তাঁর অঙ্গীকার দেখেই তিনি এই চরিত্রে যুক্ত হয়েছেন।

দোসাঞ্জ আগেই সন্দেহ করেছিলেন যে ছবিটি ওটিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। গত সপ্তাহে এক ইনস্টাগ্রাম লাইভে তিনি ভক্তদের বলেছিলেন, “আমার মনে হচ্ছে, সোমবারের মধ্যে ছবিটি নামিয়ে নেওয়া হতে পারে। তবে কোনো চিন্তা নেই, আপনারা এটি ডাউনলোড করে নিন।” পরে রাজস্থানে খোলা আকাশের নিচে একটি গণপ্রদর্শনীর ভিডিও ক্লিপ তিনি এক্সে (সাবেক টুইটার)-এ ভাগ করে পাঞ্জাবিতে লিখেছেন, “হুন নি রুকনি ফিল্ম। খালরা সাব দি আওয়াজ নু কোই নিথে দাবা সাকদা।” (অর্থাৎ, এই ছবি আর থামানো যাবে না; খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না)।

জি-ফাইভ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ‘জি-ফাইভ গ্লোবাল’-এ ছবিটি এখনও দেখা যায়, কিন্তু ভারতের ক্যাটালগ থেকে এটি সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে মুক্তির পর দর্শকদের সাড়া অভিভূত করেছে, তারা ছবিটির সৃজনশীলতাকে সমর্থন করে, তবে “বর্তমান পরিস্থিতির” কারণে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত ভারতে স্ট্রিমিং বন্ধ থাকবে। জি-ফাইভ যুক্তি দিয়েছে যে তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছবিটি দ্রুত ভারতীয় দর্শকদের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে।

ছবিটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শিরোমণি আকালি দলের সভাপতি সুখবীর সিং বাদল বলেন, এটি আমাদের যৌথ স্মৃতি, সত্য এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। কংগ্রেস নেতা সুখপাল সিং খাইরা ছবিটি দ্রুত ওটিটি-তে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন এবং বলেছেন ছবিতে দেখানো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সঙ্গে আদালতের রায় মিল রয়েছে। আম আদমি পার্টির সংসদ সদস্য মালবিন্দর সিং কাং কেন্দ্রের বিষয়টি নিয়ে সরাসরি সমালোচনা করে বলেছেন, ছবিটি ব্লক করে বিজেপি তাদের প্রকৃত মুখ তুলে ধরেছে। শিরোমণি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটি (এসজিপিসি)-র মহাসচিব কুলবন্ত সিং মানান বলেছেন, পাঞ্জাবের ইতিহাস নিয়ে মানুষ নিজে দেখে মতামত তৈরির অধিকার রাখে।

চলচ্চিত্রটির ওটিটি মুক্তি সহজ ছিল না—এটি তিন বছর ধরে সেন্সর সংক্রান্ত জটিলতার মুখোমুখি ছিল। ২০২২ সালে ‘ঘাল্লুঘারা’ নামে সিবিএফসির কাছে পাঠানো হলে বোর্ড ১২৭টি দৃশ্য কাটার নির্দেশ দিয়ে ছবির নাম পরিবর্তন করে ‘পাঞ্জাব ৯৫’ করার প্রস্তাব দেয়। প্রযোজকরা প্রথমে বম্বে হাইকোর্টে আপিল করেন, পরে তা প্রত্যাহার করেন। ২০২৩ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার পর অবশেষে ২০২৪ বা ২০২৫-এর ৩ জুলাই ‘সতলুজ’ নামে জি-ফাইভে মুক্তি পায়।

পরিচালক হানি ত্রেহান বলেছেন, থিয়েটার রিলিজ পাওয়ার সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় গোপনে ওটিটি মুক্তির পরিকল্পনা করা হয়। সেন্সর বোর্ড থেকে স্পষ্ট কারণ ছাড়া বিলম্বের পরে প্রযোজকরা সেন্সর সার্টিফিকেট না নিয়ে সরাসরি ওটিতে মুক্তি দিয়েছেন। দিলজিৎ দোসাঞ্জও দাবি করেছেন যে প্ল্যাটফর্মে ছবিটি কোনো কাটছাঁট ছাড়াই স্ট্রিম করা হয়েছিল।

কেন এই চলচ্চিত্রটি এত গুরুত্বপূর্ণ? ছবিটি পাঞ্জাবের ইতিহাসের একটি রক্তাক্ত অধ্যায়কে কেন্দ্র করে তৈরি—জশবন্ত সিং খালরা ১৯৯০ দশকে পাঞ্জাব পুলিশের হাতে নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে তদন্ত করে প্রায় ২৫ হাজার দেহের রহস্য উদঘাটন করেন। তার ওই কাজের ফলে বহু পুলিশ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ পায়। ১৯৯৫ সালে খালরাকে এলোপাতাড়ি অপহরণ করে পুলিশ হেফাজতে হত্যা করা হয়; সিবিআই তদন্তের পরে ২০০৭ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট চারজন পুলিশকর্মীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

ছবিটি ভারতের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর সিনেমা ও মিডিয়া জগতে ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও পক্ষপাতমূলক সেন্সরশিপের অভিযোগ নতুন করে উসকে উঠেছে। সমালোচকরা প্রশ্ন করছেন, যেখানে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ও উগ্র রাইট-উঙ্গ ছবিগুলো—যেমন ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ (২০২২), ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ (২০২৩) বা ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ (২০২৫)—সহজে মুক্তি পেয়েছে, সেখানে পাঞ্জাবের বাস্তব ঘটনার ওপর নির্মিত মানবাধিকারকেন্দ্রিক একটি চলচ্চিত্র কেন দর্শকদের থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এই বিতর্ক চলতেই পারে—আইনি লড়াই, জনমত ও রাজনৈতিক চাপ একসঙ্গে ছাপ ফেলবে আগামী দিনগুলোতে। সবশেষে কি দর্শক ‘সতলুজ’-কে ভারতে দেখতে পারবে, তা নির্ভর করছে আইনি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর।