ঢাকা | রবিবার | ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৯ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

মোট ঋণের এক তৃতীয়াংশ খেলাপি: গভর্নর বললেন, সমাধানে ৫-১০ বছর সময় লাগবে

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মন্তব্য করেছেন যে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিন ধরে থাকা খেলাপি ঋণের সংকট কাটিয়ে উঠতে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর লাগবে। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ কোন ছোটোখাটো সমস্যা নয়। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি হয়ে গেছে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকগুলো চালাতে হচ্ছে, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

আজ শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত চতুর্থ ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন-২০২৫’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে এসব কথা বলেন তিনি। এই সম্মেলনের শিরোনাম ছিল ‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’, যা আয়োজন করেছে দৈনিক বণিক বার্তা। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম, এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন।

গভর্নর উল্লেখ করেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি দ্রুত হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তিকে যখন নতুন তথ্য ও নতুন ক্লাসিফিকেশন নিয়ম কার্যকর হয়, তখনই দেখা যায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। কিছু বছর আগে ধারণা ছিল, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশের মতো হতে পারে; তখন সরকারের ধারণা ছিল এটি ৮ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে তা ইতিমধ্যে ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

গভর্নর আরও বলেন, এই পরিস্থিতি রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। দেশের ব্যাংক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও অনেকদিন এই সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। ধাপে ধাপে ব্যাবস্থা গ্রহণ করে আগালেই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোলা যাবে। তিনি আশার কথা জানিয়ে বলেন, দেশের ডলার পর্যাপ্ত রয়েছে, এবং এ বছর রমজানে ঋণপত্র খোলা ও পণ্য আমদানি নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। গত বছরের তুলনায় এই সময়ের মধ্যে ঋণপত্র খোলা ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিআইডিএস মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, এখনকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ‘চোর ধরা’ মনোভাবের মতো। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি指出 করেন, দেশে অনেক নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলেও তাদের পরিচালনা ও দায়বদ্ধতার কাঠামো দুর্বল। দেশের কর ব্যবস্থাও এখন যেন জমিদারি শাসনের মতো আচরণ করছে, যেখানে কর সংগ্রহের লক্ষ্যটাই যেন শুধু রাজস্ব আদায়। তিনি আরও জানান, বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। অন্যান্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির কারণে সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি খুব কম, তাই শিল্পায়ন ধিরেগামীতে চলেছে।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও অন্যান্য মাশুল দেওয়ার পাশাপাশি, অগ্রীম আয়করও আরোপ করা হয়েছে। সম্প্রতি টার্নওভার করের হার বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে, যা বড় কোম্পানিগুলোর জন্যও burdensome হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন উল্লেখ করেন, ব্যাংকগুলোতে শাসন ও শৃঙ্খলা ফিরছে। আগে অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ ছিল, এখন নিয়ম অনুযায়ী ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নির্বাচনের পরে বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত হবে এবং দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হবে।