ঢাকা | সোমবার | ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দকৃত ১২ বিলিয়ন ডলার ছেড়ে দিচ্ছে

দীর্ঘ সংঘাত ও কূটনৈতিক টানাপোড়নের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। দুই পক্ষ শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষর করবে বলে জানানো হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

খবরে বলা হয়েছে, কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে ইরানি আলোচক দলকে সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া হস্তান্তর করেছে। খসড়ার ১৪টি শর্ত পর্যালোচনার পরে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, উভয় দেশের মধ্যে চূড়ান্ত স্বাক্ষরের ব্যাপারে সম্মতি হয়েছে। ওই শর্তগুলোর মধ্যে একটি বড় ইস্যু ছিল মার্কিন জব্দকৃত সম্পদ ইরানের কাছে হস্তান্তর করার ব্যাপার—মোটেই যার পরিমাণ হিসেবে ২৪ বিলিয়ন ডলারের কথা উঠেছে।

ইরানের আধা-সরকারি সংস্থা মেহের জানিয়েছে, আলোচনা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র জব্দ করা ১২ বিলিয়ন ডলার ইরানকে ফেরত দেবে। একই সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা চলবে এবং ওই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা মোট ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেওয়া হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপিও খসড়ায় দেখা গেছে, ‘‘আলোচনা শুরুর আগেই এই অর্থের অর্ধেক ইরানকে ফেরত দেওয়া হবে’’—এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন এখনও চুক্তির খুঁটিনাটি সম্পর্কে স্পষ্ট মন্তব্য করেনি, যা বিষয়টি বিতর্কিত করে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত রাখা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে আসছে, তাই আর্থিক ছাড় এবং নিষেধাজ্ঞা নরম করাকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছরের মার্কিন হামলার পর ইরানের কিছু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ভূগর্ভে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়াও নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান কি ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখবে—এ বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা এখনও চলমান; কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

চুক্তির মূল ১৪ দফা সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো:

১. লেবাননসহ সব লড়াইক্ষেত্রে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে অস্ত্রবিরতি কার্যকর করা হবে।

২. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না বলে অঙ্গীকার করবে।

৩. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

৪. ইরানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কাছাকাছি থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে।

৫. ইরানের তেল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হবে এবং ইরানকে তার জ্বালানি আয়ের ওপর পূর্ণ প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে।

৬. যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও অর্থায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রস্তাব রেখেছে।

৭. চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের মধ্যে বিশেষ আলোচনা শুরু হবে; এর মূল বিষয় হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং স্থায়ীকালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

৮. ইরান নন-প্রোলিফারেশন ট্রিটি (এনপিটি)–র আওতায় পুনরায় নিশ্চিত করবে যে তারা কোনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা উন্নয়ন করবে না।

৯. অন্তর্বর্তীকালীন আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে নতুন কোনো সেনা মোতায়েন করবে না।

১০. আলোচনা চলাকালীন ইরানের ওপর নতুন কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে না।

১১. আলোচনা চলাকালীন ইরানের স্থগিত থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের ফ্রিজড অ্যাসেট অবমুক্ত করা হবে।

১২. চুক্তির শর্তগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা তদারকির জন্য একটি যৌথ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হবে।

১৩. চূড়ান্ত সমঝোতার বৈধতার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আনুষ্ঠানিক সমর্থন বা অনুমোদন নেওয়া হবে।

১৪. ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্র বা সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের বিষয়গুলো এই আলোচনার আওতার বাইরে রাখা হবে।

এই চুক্তি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি এবং অর্থনীতিতে তা বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এখনও অনেকই প্রশ্ন রয়েছে—কিছু শর্ত কিভাবে বাস্তবে পরিণত হবে, তহবিল ও নিষেধাজ্ঞা মুক্তিকরণ যথাসময়ে সম্পন্ন হবে কি না, এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা কীভাবে গৃহীত হবে—এসবই এখন তদন্ত ও আলোচনার বিষয়।