বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জব্দকৃত চালান থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকার ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বেবিওয়্যার ও প্রসাধনী সামগ্রী রহস্যজনকভাবে উধাও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে ওই জিনিসগুলোর স্থলে নিম্নমানের দেশীয় পণ্য রাখা হয় বলে কাস্টমস জানিয়েছে, ঘটনার পর বন্দরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সাফা ইমপ্লেক্স ১২ মার্চ ভারত থেকে একটি চালান আমদানি করে (ম্যানিফেস্ট নম্বর 60120260010016333)। সিএন্ডএফ এজেন্ট হিসেবে চালানটি গ্রহণ করেছিল মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজ এবং চালানটি বেনাপোল স্থলবন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে রাখা হয়। আমদানি নথিতে পণ্যের ঘোষণা বেকিং পাউডার হলেও কায়িক পরীক্ষায় ১০৮ কার্টনে ঘোষণা বহির্ভূত প্রায় ৬ কোটি টাকার ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বেবিওয়্যার, ফেসওয়াশ, ক্রিম, লোশনসহ বিভিন্ন প্রসাধনী পাওয়া যায়। কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী এর ফলে ২,৩২,৬৪,৫১৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হচ্ছিল।
ঘটনাটি ২০২৩ সালের কাস্টমস আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় জব্দ করে বেনাপোল কর্তৃপক্ষের জিম্মায় রাখা হয় এবং খালাস না হওয়া পর্যন্ত চালানটি সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সিএন্ডএফ এজেন্ট মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্সও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। নথিতে সতর্কতা হিসেবে ১২ মার্চ, ২ এপ্রিল ও ২০ মে বন্দর কর্তৃপক্ষকে আলাদা তিনটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবু কোরবানি ঈদের ছুটির মধ্যে তালাবদ্ধ ৩৭ নম্বর শেড থেকে জব্দকৃত ভারতীয় পণ্য সরিয়ে ফেলে সেখানে দেশে নির্মিত নিম্নমানের বিকল্প পণ্য রাখা হয় বলে কাস্টমস তদন্তে পেয়েছে। কাস্টমসের শুল্ক গোয়েন্দারা বিষয়টি অনুসন্ধান করে ২ জুন বন্দর ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি উপস্থিতিতে চালানটি পুনরায় কায়িক পরীক্ষার উদ্যোগ নেন এবং পরীক্ষায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, বদলে রাখা পণ্যগুলোর কার্টনে বাংলাদেশি বসুন্ধরা ও মেঘনা শিল্পগ্রুপের কোম্পানির নাম ছাপা ছিল, পাশাপাশি দেশীয় সংবাদপত্রে মোড়ানো ও কুরিয়ার সার্ভিসের স্টিকারযুক্ত পিপি ব্যাগও পাওয়া গেছে। এসব আলামত ইঙ্গিত দেয় যে পণ্যগুলো দেশের ভেতর থেকেই সেখানে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, বন্দরটির প্রতিটি শেডে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও সিসিটিভি ব্যবস্থা থাকায় অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া এমন কাজ করা প্রায় অসম্ভব।
কাস্টমস ৩ জুন এক চিঠিতে জানায় যে জব্দকৃত পণ্যের নিরাপত্তা-সংরক্ষণে ওয়্যারহাউস রক্ষকের দায়িত্ব রয়েছে। বন্দরের জিম্মায় থাকা অবস্থায় পণ্য পরিবর্তন ও সরিয়ে ফেলার ফলে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে; সেই কারণে হারানো পণ্যের বিপরীতে ২,৩২,৬৪,৫১৫ টাকা রাজস্ব বন্দর কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করতে হবে। একই চিঠিতে ৩৭ নম্বর শেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাও জানাতে বলা হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) মোঃ শামীম হোসেন বলেন, ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষাসহ তদন্ত চলছে। শেড ইনচার্জ মোঃ শাহজালালকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মোঃ রুহুল আমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছেন; তদন্ত প্রতিবেদন আসলে প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে সিএন্ডএফ এজেন্ট মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান দাবি করেন, তাদের প্রতিষ্ঠান চালানটির খালাসের জন্য কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। তিনি জানান, রাজু নামের একজন ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং অভিযুক্তের পরিচয় কাস্টমসকে জানানো হয়েছে। এছাড়া আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সাফা ইমপ্লেক্স কাগজে-কলমে একজন নারীর নামে থাকলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ অ্যাশরাফ হোসেন ওরফে বাবু নামে এক ব্যবসায়ীর হাতে রয়েছে—তাঁর বক্তব্য জানার জন্য যোগাযোগ করলে ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-সূত্ররা বলছেন, প্রথমে মিথ্যা ঘোষণায় বিশাল পরিমাণ পণ্যের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টার অভিযোগ ছিল। পরে কাস্টমস চালানটি জব্দ করলে বন্দরের অভ্যন্তরীণ কোনও সহযোগিতায় জব্দকৃত দামি পণ্য সরিয়ে ফেলে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনাটিতে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার সন্দেহ রয়েছে এবং কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কড়াকড়ি আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। তদন্ত চলছে; রিপোর্ট পাওয়ার পর বিস্তারিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




