ঢাকা | শুক্রবার | ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৯শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

মাসুদ খান বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান; নাহিদ, নাফিজ-আল-তারিক ও তানভীর কমিশনার নিয়োগ

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের মাসুদ খান নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নারী আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফিজ-আল-তারিক এবং আশা ইন্টারন্যাশনের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তাদের নিয়োগ চূড়ান্ত করেছে। প্রত্যেকেই যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর মেয়াদে এই পদে দায়িত্ব পালন করবেন। সূত্র জানায়, আজ বিকেলে তিনজন যেতে বিএসইসির কার্যালয়ে যোগদানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ৫(২) অনুযায়ী মাসুদ খানকে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়েছে। নিয়োগ কার্যকর করার আগে তাকে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সকল কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে হবে। বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরকারি চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

মাসুদ খান দীর্ঘদিনের করপোরেট ও ফিন্যান্স পেশাজীবী। তিনি বর্তমানে ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের গ্রুপ সিইও ও ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে তিনি লাফার্জহলসিম বাংলাদেশে ১৮ বছর চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) হিসেবে এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে ২০ বছর ধরে উচ্চ পদে কাজ করেছেন। তাছাড়া তিনি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, ম্যারিকো বাংলাদেশ, সিঙ্গার বাংলাদেশ ও কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর স্বাধীন পরিচালক হিসেবেও যুক্ত ছিলেন।

বিশিষ্ট একজন অভিজ্ঞ করপোরেট নেতার নিয়োগের পথ সুশৃঙ্খল করতে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট আইনি বাধা দূর করেছে সরকার। আগের বিধান অনুসারে বিএসইসির চেয়ারম্যানের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৬৫ বছর ছিল। তবে ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধনী) বিল ২০২৬’ পাস হওয়ার ফলে এই বয়সসীমা সরানো হয়েছে, যা মাসুদ খানের মতো অভিজ্ঞ পেশাজীবীকে কমিশনে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

নিয়োগের আগে গত সপ্তাহে বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং চার কমিশনার মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফুদ্দিন পদত্যাগপত্র দায়ের করেন। পুঁজিবাজারের অনেকে বলছেন, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, লেনদেন সংকট ও বিনিয়োগকারীদের অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে এই পদত্যাগগুলো ঘটেছে। কমিশনারদের পক্ষ থেকে পদত্যাগ সম্পর্কে প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখনও মেলেনি।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান। বেশ কিছু বিশ্লেষক আশা করেন, মাসুদ খানের নেতৃত্বে নিয়মভিত্তিক ও পেশাদার উদ্যোগ গ্রহণ করে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক সংস্কারের সূচনা হবে।

প্রসঙ্গত, প্রাক্তন চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে গত ২১ মাসে কমিশন বেশ কয়েকটি নিয়ন্ত্রক বিধি-নিয়ম প্রণয়ন করেছে। গেজেট আকারে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ বিধি-নিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্জিন ঋণ, আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব), মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ঋণপত্র এবং হুইসেলব্লোয়ার সম্পর্কিত বিধি। পাশাপাশি করপোরেট গভর্ন্যান্স, অডিট ও করপোরেট পুনর্গঠন সংক্রান্ত কয়েকটি খসড়া বিধিমালা জনমত আদায়ের জন্য প্রকাশ করা হয়।

রাশেদ মাকসুদ তার পদত্যাগবিবৃতিতে বলেন যে, তার দায়িত্বকালজুড়ে কমিশন বাজারের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সংস্কার ও বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করেছে। তিনি উদ্বুদ্ধ ছিলেন বাজারে কমপ্লায়েন্স ও এনফোর্সমেন্ট জোরদার করার মাধ্যমে নিয়ম-ভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য।

তবে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা মেনে নিচ্ছেন যে, বাজারে ধারাবাহিক দরপতন, লেনদেন হ্রাস ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুন্ন হওয়া—এসব সমস্যার সমাধান সহজ নয়। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী একাধিক মঞ্চে বলছেন যে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্য নিয়ে কমিশনকে পুনরায় সাজানো হচ্ছে এবং নিয়োগগুলো সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই করা হয়েছে।

বাজারে লেনদেন বাড়ানো, শেয়ারদর স্থিতিশীল করা এবং নিয়ন্ত্রক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা—এসবই নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সামনে অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে। অভিজ্ঞ প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের সমন্বয়ে বাজারে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা আনার প্রত্যাশা রয়েছে।