ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

পশ্চিমবঙ্গে এবার ঈদের সরকারি ছুটি কমিয়ে এক দিন করে দিল শুভেন্দু সরকার

ঈদুল আজহার খুশির আগমনী বার্তা তৎপরভাবে নড়েচড়ে বসিয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়—তবে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে এ বার উৎসবের ছুটির দিন কমেছে। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে রাজ্যে ঈদ উপলক্ষে দুই দিন সরকারি ছুটি দেওয়ার রীতি ছিল। বছরের শুরুতে মমতা সে নিয়মই ধরে রেখে ঘোষণা করেছিলেন, ঈদুল আজহার দিন ২৬ ও ২৭ মে রাজ্যজুড়ে সরকারি ছুটি থাকবে। কিন্তু নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার সেই ছুটি কট করে দিয়েছেন।

নবান্ন থেকে শনিবার জারি করা বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এবার ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকবে শুধু ২৮ মে, বৃহস্পতিবার—২৬ বা ২৭ মে নয়। প্রশাসন ও নবান্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, চাঁদ দেখে ঈদের আনুষ্ঠানিক তারিখ পরিবর্তনের কারণেই ছুটির দিন বদলানো হয়েছে। সাধারণত চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই ঈদের দিন নির্ধারিত হওয়ায় ক্যালেন্ডার-ফিক্সড পূর্বানুমানের বদলে বাস্তব নিরীক্ষা লক্ষ্যে বৃহস্পতিবারটিকেই ছুটির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিরোধীরা এই সিদ্ধান্তকে কেবল উৎসব-তারিখের বাস্তব সমন্বয় বলে দেখেননি। অনেকেই বলেন, এর পেছনে একটি গোপন রাজনৈতিক সংকেত লুকিয়ে থাকতে পারে। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই শুভেন্দু অধিকারীর সরকার কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর বিশেষ করে প্রভাব ফেলেছে বলেই তাদের অভিযোগ।

ঈদের ঠিক আগেই নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত 이미 খামারি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ১৩ মে সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়—রাজ্যের যে কোনো জায়গায় গরু-মহিষ জবাইয়ের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি জরুরি হবে এবং জবাইযোগ্য গরুর ন্যূনতম বয়স ১৪ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই নির্দেশিকার প্রভাব পড়তেই কোরবানির সময় গবাদি পশুর কেনাবেচা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের বহু হিন্দু খামারি ও গরু ব্যবসায়ীরা ভুগছেন। পশু-পালন করে প্রান্তিক এই খামারিরা কোরবানি মৌসুমে এক বছরের আয়ের বড় অংশই আদায় করেন। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর-দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মালদহের মতো এলাকায় প্রতি বছর কোরবানির মরশুমে কোটি টাকা পর্যায় পর্যন্ত লেনদেন হয়। এই বছর নীতিগত জটিলতা ও পুলিশের হয়রানি-ভীতি দেখেই ক্রেতারা হাটে আসছেন না বা গরু কেনা থেকে বিরত থাকছেন—ফলে বিক্রি বন্ধ, আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতি দেখা দিয়েছে।

বাজারে ক্রেতারা অনেকে ছাগল বা ভেড়া কেনার দিকে ঝুঁকছেন, কেউ কেউ সম্পূর্ণই কোরবানির পরিকল্পনা বাতিল করছেন। খামারিরা জানাচ্ছেন, বিক্রি না হলে ঋণের বোঝা মেটানো কঠিন হয়ে যাবে; বড়মাপের লোকসান হলে সামনের মৌসুমেও কার্যক্রম চালানো দুরূহ হবে। কিছু ক্ষুব্ধ খামারি ও ব্যবসায়ী কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবিও জানাচ্ছেন।

সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, দেশের মাংস রফতানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কথা বিবেচনায় নিয়ে কেন অভ্যন্তরীণ বাজারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি-পেশাজীবীদের ওপর এত বিধিনিষেধ চাপানো হচ্ছে। তাদের মতে, এই ধরনের নীতি সবচেয়ে বেশি আঘাত করে প্রান্তিক কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর।

সরকারি ব্যাখ্যা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আক্ষেপ—দুই প্রশ্রয়ই এখন সামনে। উৎসবের মুখে এই বিতর্ক ফিরuuml;চ্ছে রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গে। উৎসব ও জীবিকা—উভয়কেই সাথে রেখে কৌশলগত নমনীয়তার আহ্বান করছে অনেকেই, যাতে মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সামলে নেয়া যায়।

(সূত্র: আনন্দবাজার, দ্য ওয়াল)