ঢাকা | বুধবার | ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১২ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

হিমন্ত বিশ্বশর্মা: প্রার্থনা করি ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নতি না হয়

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি প্রতিদিন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন যেন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের মতো বজায় থাকে এবং পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্ব বাড়ে না। তিনি এ কথাগুলো বলেছেন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবিপির সঙ্গে একটি দীর্ঘ আলাপচারিতায়, যার কিছু অংশ সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সাক্ষাৎকারটি ১৫ এপ্রিল সম্প্রচারিত হয়েছিল।

হিমন্তের বক্তব্যের অন্যতম কটাক্ষ — ‘‘আমি তো রোজ সকালে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি — (বাংলাদেশের সঙ্গে) যে পরিস্থিতি ইউনুসের সময়ে ছিল, সেটাই যেন থাকে, সম্পর্কের উন্নতি যেন না হয়।’’

সাক্ষাৎকারে তিনি ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কীভাবে সীমান্তে অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ঘন রাতের অন্ধকারে ধাক্কা দিয়ে ফেরত পাঠায়, তারও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তার কথায়, কবে কীভাবে ‘‘পুশ‑ব্যাক’’ করা হয়, তা নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর; কখনও ১০ দিন, কখনও ২০-৩০ বা ৪০ দিন ধরে আটক রাখা হয় এবং যেখানে বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর, এখন বিজিবি) নেই সেসব স্থানে ধাক্কা মেরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বশর্মা সাক্ষাৎকারে বিজিবির পূর্বের নাম ‘বিডিআর’ই উল্লেখ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, আইনি পথে কাউকে ফেরত পাঠাতে চাইলে পুরো বিষয়টাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে হয়; এরপর বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হয় যে তারা কাকে গ্রহণ করবে। ‘‘এইজন্য আপনি ভারত থেকে কাউকে বাংলাদেশে পাঠাতে পারবেন না, বাংলাদেশ কাউকেই বাংলাদেশি বলে স্বীকার করে না,’’ তিনি বলেন এবং তা মিলিয়ে বিন্দুমাত্র বিকল্প হিসেবে পুশ‑ব্যাক অনুশীলিত হচ্ছে বলে দাবি করেন।

হিমন্তের এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপটেই রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঢাকায় রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানোর ঘোষণা দেয়—বিশ্লেষকরা বলছেন দুই দেশের মধ্যকার দূরত্ব কমানোর সঙ্কেত দেওয়ার জন্য এটি করা হয়েছে। এ সময় মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য অনেককে বিস্মিত করেছে।

আইনি প্রশ্নও উঠেছে। বিশ্বশর্মা যে ‘‘অভিবাসী (আসাম থেকে বহিষ্কার) নির্দেশ, ১৯৫০’’ আইনের কথা উল্লেখ করেছেন, আইনজ্ঞদের একাংশ বলছেন ওই আইন দিয়ে সাধারণত এ রকম পুশ‑ব্যাক করা যাবে না, কারণ তা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের জন্যই প্রণীত হয়েছিল। গৌহাটি হাই কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী হাফিজ রশিদ চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এক্সিকিউটিভ অর্ডারের মাধ্যমে ভাসমান সীমান্ত জটিলতা এভাবে সমাধান করা সহজ নয় এবং আইনগত বাধা রয়েছে।

এবিপির সাংবাদিক মেঘা প্রসাদের প্রশ্নে হিমন্তের কথায় তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমাদের ভালো লাগে যখন ভারত‑বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো থাকে না, কারণ যখন সম্পর্ক ভালো হয়ে যায়, তখন ভারত সরকারও চায় না পুশ‑ব্যাক করতে।’’ মেঘা মন্তব্য করেন, ‘‘এটা তো ভারত‑বিরোধী কথা হয়ে যাচ্ছে।’’ জবাবে বিশ্বশর্মা বলেন, ‘‘আমি তো প্রতিদিন সকালে সবসময়ই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি… আমি তো মনের কথা বললাম।’’

বিশ্লেষক ও অধ্যাপকরা মন্তব্য করেছেন, অনুপ্রবেশ ইস্যুটি দুটি দেশের মিলিত সমাধান চাই। ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, অনুপ্রবেশের সমস্যা শুধু আসামের নয় — এর সঙ্গে পরিচয়পত্র, ভিতরে মিলাপ্ত প্রক্রিয়া, প্রশাসন—all মিলিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। তিনি এমন অসাবধানিক মন্তব্য সমস্যার সমাধানে সাহায্য করবে না এবং ভারতকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

অন্য দিকে ঢাকা‑পদস্থ কূটনীতিবিদরা—যেমন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী—মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন না করলেও বলেন, ‘‘এটা নতুন কিছু নয়’’; অনেক সময় সীমান্তে পুশ‑ব্যাক হওয়ার বাস্তবতা থেকেও তারা অনুধাবিত। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে পদ্ধতিগত সমস্যা রয়েছে এবং ধৃতদের দ্রুত ফেরত দেওয়ার প্রয়োজনে কিছু ছোটখাটো অনুশীলন শুরু হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন।

আইনগতভাবে ছালাও প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কিছুক্ষেত্রে পুশ‑ব্যাক করা ব্যক্তিদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে আদালত বা প্রশাসন, ফলে লোকদের ফেরত নেওয়া হয়। এইসব দৃষ্টান্ত দেখিয়ে আইনজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও কাজের ধরণ প্রমাণভিত্তিক, স্বচ্ছ এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার মতো হওয়া উচিত।

হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্য রাজনীতি, আইন ও কূটনীতির সীমানায় এক সতর্ক চিন্তার উদ্রেক করেছে। দুই দেশের সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে হলেও সীমান্ত, জনগণ ও আইনি প্রক্রিয়া—এসব বিষয়কে সম্মিলিতভাবে বিচার করে সমাধান খোঁজার ওপর বিশেষ জোর রাখতে হবে, এমনই মত বিশ্লেষকদের।