ঢাকা | শুক্রবার | ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৭ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি জাহাজ জব্দ: সাগরে উত্তেজনা তীব্র

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলসীমায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জাহাজ জব্দের পাল্টাপাল্টি ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কয়েক দিনের মধ্যে দুটি বিশাল বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজ জব্দ করার পর ওয়াশিংটনও পাল্টা পদক্ষেপ জানিয়েছে — যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে তারা ৩৮ লাখ ব্যারেল ইরানি তেলসহ দুটি ট্যাংকার হেফাজতে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই প্রতিক্রিয়াকে ‘জাহাজ যুদ্ধের’ নতুন ধাপ হিসেবে দেখছেন।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ওমান সাগর থেকে ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ ও ‘এপামিনন্ডাস’ নামক দুটি জাহাজ জব্দ করেছে। এপামিনন্ডাসটি লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এবং গ্রিক মালিকানাধীন; জাহাজটিতে ২১ জন ক্রু রয়েছে। গ্রিক কোস্টগার্ড তথ্য অনুযায়ী, ক্রুদের মধ্যে ইউক্রেনীয় ও ফিলিপিনো নাগরিক রয়েছেন এবং জাহাজটি ভারতের কোনও বন্দরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল।

এমএসসি ফ্রান্সেসকা পানামার পতাকাবাহী; এটি বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং প্রতিষ্ঠান মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি)-র মালিকানাধীন। জাহাজটিতে ক্যাপ্টেনসহ তিন নাবিক মন্টেনেগ্রো থেকে এবং অন্তত দুজন ক্রু ক্রোয়ােশিয়ার নাগরিক বলে জানা গেছে। এমএসসি কর্তৃপক্ষ অন্য ক্রুদের পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছে।

গ্রিস, ক্রোয়ােশিয়া ও মন্টেনেগ্রো সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাহাজগুলোর ক্রু সদস্যরা বর্তমানে নিরাপদ আছেন। তেহরান ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের মধ্যে মুক্তি সংক্রান্ত আলোচনা চলছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত ফল জানানো হয়নি।

ওই একই সময়ে ওয়াশিংটন দাবি করেছে, গত কয়েক দিনে তারা দুটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে, যেগুলোতে মোট ৩৮ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল ছিল—এই দাবিটি আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন আইনগত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পরে তেলের বিক্রির জন্য যে বিশেষ স্বল্পমেয়াদি ছাড় আরোপ করেছিল তা আর নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে; ফলে সমুদ্রে আটকে থাকা ওই তেলের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ দ্রুত কার্যকর হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কোন দেশ বা কোম্পানি যদি ইরান থেকে তেল কেনে তারা কড়া নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত জানুয়ারির শুরুর দিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করার পর থেকে ইরানের ওপর এই চাপ অক্ষেত্রে ‘গ্রেট প্রেশার’ কৌশলেরই অংশ।

জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা ও অতীতের নজির বিশ্লেষণ করে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, জব্দ করা তেলটির ভবিষ্যৎ সম্ভবত টেক্সাসের মতো কোনো মার্কিন বন্দরে খালাস হতে পারে—গত ডিসেম্বরে ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ ‘দ্য স্কিপার’-কে টেক্সাসে নিয়ে গিয়ে সেটি বাজেয়াপ্ত করাই এর প্রাসঙ্গিক উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগরীয় এলাকায় এই ধরণের পাল্টাপাল্টি জাহাজ জব্দ বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর বিমা প্রিমিয়াম কয়েকগুণ বাড়তে পারে এবং নিরাপত্তার কারণে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করতে হয়েছে—ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত, ও ইউরোপে পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই উত্তেজনার মধ্যে কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে, কিন্তু এখনই পরিস্থিতি কোনোভাবেই শিথিল হলো না — সমুদ্রপথে শত্রুভাব চালিয়ে গেলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা আরো বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন।