ঢাকা | মঙ্গলবার | ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

খুলনায় ‘তেলবাজ’ মোটরসাইকেল সিন্ডিকেটের রহস্য: কৃত্রিম সংকট, কালোবাজারি ও প্রতিকারপ্রস্তাব

খুলনায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ যতটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে, ততটাই দায়ী অসাধু মোটরসাইকেল চালকদের একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট — স্থানীয়ভাবে যে গ্রুপকে অনেকেই ‘তেলবাজ’ বলছেন। পেট্রোল পাম্পগুলোয় সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লাইন এবং ভোগান্তির পেছনে মূলত یہی চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেল মজুদ করছে এবং দোকানে লিটারপ্রতি অনেক গুণ বেশি দামে বিক্রি করছে।

সরেজমিন পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, সকাল ১১টায় তেল দেওয়া থাকলেও ভোর থেকেই মোটরসাইকেলের সারি কিলোমিটার ছুঁই ছুঁই করে। এদের এক বড় অংশ পেশাদারভাবে তেল সংগ্রহ করে — একবার তেল নিয়ে দ্রুত কোথাও ড্রামে ঢেলে পড়ে আবার একই বা অন্য পাম্পে ফিরে এসে পোশাক পরিবর্তন করে লাইনে দাঁড়ায়। ফলে একই এক ব্যক্তিই দিনে একাধিকবার তেল নেয়। পাম্পের কর্মীরা অভিযোগ করছেন, অনেকেই একদিনে ১০ বার পর্যন্ত তেল নিচ্ছে; এতে সাধারণ চালকদের জন্য তেল পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

এই সিন্ডিকেট ড্রামে তেল তুলে রেখে পরে খুচরা বাজারে লিটারপ্রতি সাধারণ দামের সঙ্গে ১০০–১৫০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সামান্য সংখ্যক দুষ্কৃতী পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও সাধারণ গ্রাহককে ফিরিয়ে দিচ্ছে, আবার সরকারি বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙ্গিয়ে ড্রাম ভর্তি জ্বালানি নিয়ে বাইরে চড়া দামে বেচে দেয়ার ঘটনাও পাওয়া গেছে। সম্প্রতি বন বিভাগের স্টিমারের জন্য পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে তা লবণচর এলাকায় বিক্রির সময় প্রশাসন ধরেছিল।

প্রতিরোধের চেষ্টা হিসেবে কিছু পাম্প তেল দেওয়ার সময় মোটরসাইকেলের টাওয়ারে রং দিয়ে চিহ্ন করছে, তবে চালকরা অন্য পাম্পে গিয়ে সিরিয়াল বা লাইনে এসে পুনরায় তেল ভরছেন, ফলে বিধান কার্যকর হচ্ছে না। খুলনার পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপো থেকে পাওয়া তথ্যে গত বছরের তুলনায় সরবরাহ খুব একটা কমেনি; তথাপি বাজারে চাহিদা ভিত্তিহীনভাবে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে। ডিলার ও এজেন্ট পর্যায়ে রেশনিং হচ্ছে বলে জানালেও খুচরা পর্যায়ে তা নিয়ন্ত্রণ থেকে বাহির হয়ে গেছে।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভ্রাম্যমান অভিযানও চলছে। ফুলতলার একটি পাম্প — মেসার্স নওশিন এন্টারপ্রাইজ — সম্পর্কে র‌্যাব-৬ জরিমানা করেছে; আর খুলনা জেলা প্রশাসন কাকন ফিলিং স্টেশনকে পরিমাপকরে কম দেওয়ার অভিযোগে জরিমানা করেছে। এসব উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও মজুদকারীরা এবং বাজার manipulators নতুন কৌশল নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

পেট্রোল পাম্পের শ্রমিকরা বলছেন, তারা অসহায়। ‘একজন চালক যদি একবারের বেশি তেল না নিতে পারত, প্রকৃত চালকেরাই বঞ্চিত হত না,’ এক কর্মীর মন্তব্য। পাম্প মালিকরাও বলেন, সংকটকে পুঁজি করে অনেকে স্বার্থ লুটছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে সমস্যা মোকাবিলায় ডিজিটাল সমাধানের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবে একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার বা মোবাইল অ্যাপ চালুর কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনুযায়ী তেলের পরিমাণ এবং তেল নেওয়ার অন্তততম সময় অন্তর-নিয়ম (উদাহরণ: ৩ দিনে একবার) স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যাবে। এতে একজন চালক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অন্য কোনো পাম্প থেকে তেল নিতে পারবে না এবং কৃত্রিম পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ ট্যাংকলরি ওনার্স এসোসিয়েশনের (খুলনা বিভাগ ও বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা) সাধারণ সম্পাদক মোঃ সুলতান মাহমুদ পিন্টু জানাচ্ছেন, ‘এ সংকট সরবরাহের চেয়ে বেশি অব্যবস্থাপনার ফল। মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে থাকবে। অবিলম্বে অ্যাপভিত্তিক বণ্টন ব্যবস্থা এবং তেল ভাঙার সময় গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করলে কালোবাজারি কমানো সম্ভব।’

প্রয়োজনে প্রশাসনকে কঠোরভাবে অভিযান চালিয়ে মজুদের উৎস শনাক্ত করতে হবে, পাম্প পর্যায়ের তদারকি জোরদার করতে হবে এবং দ্রুত ডিজিটাল বণ্টন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে প্রতিবার তেল বরাদ্দ ট্র্যাকযোগ্য করা প্রয়োজন। নয়তো সহজ সরল সাধারণ নাগরিকই প্রতিটি সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগেন।