ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৬শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

ফোনে আড়িপাততে মরিয়া ভারত সরকার, এবার স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের পরিকল্পনা

ভারত সরকার নজরদারির আধুনিকীকরণে নতুন একটি পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছে, যেখানে আরেকধাপে স্মার্টফোনগুলোতে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে স্থানে থাকার খবর বা স্থান নির্ধারণের সেবা সবসময় চালু থাকবে। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অনুমতি বা সেটি বন্ধ করার সুযোগ থাকবে না, যা অধিকতর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ব্যবস্থা চালু হলে সরকার বা প্রভাবশালী সংস্থাগুলির জন্য ব্যবহারকারীকে নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করাও অনেক সহজ হয়ে যাবে।

খবরের সূত্র অনুযায়ী, বিভিন্ন নথি, ইমেল এবং মোট পাঁচটি স্বতন্ত্র সূত্রের ভিত্তিতে রয়টার্স এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, যদি এই প্রস্তাব কার্যকর হয়, তাহলে স্মার্টফোনে থাকা লোকেশন পরিষেবাগুলোর উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে, এবং ব্যবহারকারী চাইলে সেই পরিষেবাগুলো ডিঅ্যাকটিভেট বা বন্ধ করতে পারবেন না। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সাধারণত এই-জিপিএস প্রযুক্তি তখনই সক্রিয় হয় যখন ব্যবহারকারী কোন অ্যাপ চালু করে বা জরুরি কল করে, কিন্তু নতুন প্রস্তাব এড়াতে পারবে না। ফলে, সরকারের জন্য ব্যবহারকারীর অবস্থান প্রায় নিখুঁতভাবে জানতে পারা সহজ হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রিটেনের ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ জুনাদে আলী এই নতুন পরিকল্পনাকে ‘একটি সম্পূর্ণ নজরদারি ডিভাইস’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, যদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তবে ফোনগুলো সম্পূর্ণরূপে বর্তমানের থেকে আলাদা একটি নজরদারির যন্ত্র হয়ে উঠবে।

এর আগে, মোদি সরকার সকল ডিভাইসের মধ্যে একটি রাষ্ট্র পরিচালিত সাইবার নিরাপত্তা অ্যাপ প্রি-লোড করার নির্দেশ দিলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্কের মুখে সেটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। এই পরিস্থিতি কাটতে না কাটতেই নতুন পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।

অতিরিক্ত তদন্তে দেখা যায়, টেলিকম সংস্থাগুলোর কাছে আইনি অনুরোধ করেও তারা ব্যবহারকারীর সঠিক অবস্থান নির্ধারণে অক্ষম। বর্তমান ব্যবস্থায়, সংস্থাগুলো কেবলমাত্র সেলুলার টাওয়ার ডেটা ব্যবহার করে থাকে, যা আনুমানিক এলাকা নির্দেশ করে। এই ডেটা অনেকাংশে ব্যবহারকারী থেকে কিছু মিটার দূরে দেখায়। অন্যদিকে, এই-জিপিএস প্রযুক্তি এক মিটারের মধ্যেই অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম।

প্রস্তাবিত এই প্রযুক্তির ব্যাপারে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগ সংস্থা যেমন রিলায়েন্সের জিও ও ভারতী এয়ারটেল-এর প্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারের যদি নির্দেশনা থাকে, তবে তারা এ-জিপিএস প্রযুক্তিক সক্রিয় করতে পারে।

বিশেষ করে, লবিং সংস্থা ইন্ডিয়া সেলুলার অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স অ্যাসোসিয়েশন (আইসিইএ), যা অ্যাপল ও গুগলের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের এক গোপন চিঠিতে জানিয়েছে, এই ধরনের স্থান ট্র্যাকিং ব্যবস্থা অন্য কোথাও দেখা যায় না এবং এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

অপরদিকে, মার্কিন ভিত্তিক নিরাপত্তা গবেষক কুপার কুইন্টিন এমন পরিকল্পনাকে ‘সত্যিই ভয়ানক’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এই ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা লঙ্ঘনের 위험 বাড়াতে পারে।

এখনো ভারতের সরকার এই বিষয়ে কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেনি, তবে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি ও লবিং সংস্থা এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সোচ্চার। তারা মনে করছে, এই ব্যবস্থা সাধারণ মানুষ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী যেমন সামরিক অফিসার, বিচারক, কর্পোরেট কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠবে, কারণ তাঁদের সংবেদনশীল তথ্য থাকায় তাঁদের নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্ভাবনা বাড়বে।

অন্যদিকে, টেলিযোগাযোগ সংস্থাগুলোর দাবি, পুরোনো ট্র্যাকিং পদ্ধতিগুলোর কারণে অনেক সময় সমস্যা হয়, বিশেষ করে যখন মোবাইল প্রস্তুতকারীরা ব্যবহারকারীদের সতর্ক করার জন্য পপ-আপ বার্তা দেখায়। সেই বার্তাগুলোতে লেখা থাকে যে, তাদের নেটওয়ার্কের দ্বারা তাঁদের স্থানাঙ্কের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এতে ব্যবহারকারীরা সহজেই বুঝতে পারে যে তাদের স্থান ট্র্যাক করা হচ্ছে। ফলে, সংস্থাগুলো সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে, এই পপ-আপ ফিচারটি ডিঅ্যাকটিভেট করার সুযোগ দিতে। তবে আইসিইএ বলছে, ব্যবহারকারীর স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে এই ধরনের সতর্কতা সংবিধান ও গোপনীয়তা নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।