ঢাকা | সোমবার | ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

জামায়াত পেশ করল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ‘ছায়া বাজেট’

বাংলাদেশ জামায়তে ইসলামী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ প্রস্তাব করেছে। দলটি বলছে, এই বাজেটের লক্ষ্য হচ্ছে অতীত ফ্যাসিবাদী শাসনমলের দুর্নীতি-অর্থপাচারের ক্ষত সারিয়ে ইনসাফভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী একটি রাষ্ট্র গঠন করা।

মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জামায়াতের ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও নেতা সাইফুল আলম খান মিলন এই ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা এবং রাজস্ব আয় হিসেবে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। এ হিসাব অনুযায়ী বাজেট ঘাটতি দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ।

প্রস্তাবিত বাজেটের মূল দিকগুলোতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা বর্তমানে ৬৫০–৯০০ টাকার কাছাকাছি থাকায় তা প্রথমদফায় এক হাজার টাকায় এবং ধাপে ধাপে তিন হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য আলাদা ভাতার কথাও বলা হয়েছে—দেশের সকল মসজিদের ইমামদের মাসিক ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫ হাজার টাকা এবং খাদেমদের ৩ হাজার টাকা করে সম্মানী প্রদানের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

কর ও রাজস্ব নীতিতে বদল অন্বেষণ করে জামায়াত এনআইডিকে টিন হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে; অর্থাৎ আলাদা টিন নম্বর বরাবর জাতীয় পরিচয়পত্রকেই ‘বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর চালুর কথাও উল্লেখ রয়েছে।

ব্যক্তি করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কর রেয়াত হিসেবে করদাতাদের সন্তানদের পড়াশোনা খরচ বাবদ বছরে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাথাপিছু অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কররেহাই প্রদানের প্রস্তাব চালু করা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়েছে—১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারিদের জন্য ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ রয়েছে।

মাতৃত্বকালীন সেবায় তারা নতুন উদ্যোগ নিয়েছে—’সন্তান সম্ভাবনার শুরু থেকে’ সকল মায়ের জন্য দুই বছর ধরে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রাসাকে সরকারিকরণ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বক্তব্যে সাইফুল আলম খান মিলন বিগত শাসনামলের সমালোচনা করে বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের তহবিল থেকে দুর্নীতি ও অর্থপাচারে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে গেছে এবং সেই অর্থই ফেরত এনে বাজেট ঘাটতি মেটানো সম্ভব বলে তারা মনে করে। তিনি বলেন, তাদের বিকল্প বাজেট ‘সম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার উপর আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ গঠনের লক্ষ্যে তৈরি।

জামায়াত নেতা আরও বলেন, তাদের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধি নয়, সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অদক্ষতা দূর করে স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদবণ্টনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে—এটিই তাদের মূল দিকনির্দেশনা।

অনুষ্ঠানে জামায়াত জানায়, তারা জাতীয় সংসদে সরকারি বাজেট পাস হওয়ার আগে সাধারণ জনগণের কাছে নিজেদের কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ভাবনা উপস্থাপন করতেই এই বিকল্প বাজেট পেশ করেছে।