ঢাকা | বুধবার | ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৪শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

জামায়াত পেশ করল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ‘জনমুখী ছায়া বাজেট’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ ঘোষণা করেছে। দলটির উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে—ফ্যাসিবাদী শাসনের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ক্ষত সারিয়ে ইনসাফভিত্তিক এবং জনকল্যাণমূলক একটি রাষ্ট্র গঠন করা।

মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে ‘‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই ছায়া বাজেট পেশ করেন ঢাকা-১২ আসনের এমপি ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন।

মিলন জানান, প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.৪৩ শতাংশ সমান।

জামায়াতের বিকল্প বাজেট শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা বৃদ্ধি ও করছাড় ও ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশনের সহজীকরণসহ নানা প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রধান উল্লেখযোগ্য পয়েন্টগুলোতে রয়েছে—জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)কে টিন বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব ও স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর চালু করার উদ্যোগ। দলটি দাবি করেছে, এর ফলে করজাল বাড়বে এবং আদায় আরও কার্যকর হবে।

আয়কর অব্যাহতি সীমা বাড়িয়ে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫ লাখ টাকায় নেওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তাছাড়া করদাতাদের সন্তানদের শিক্ষাব্যয়ের কারণে বছরে ৫০ হাজার টাকার কররেয়াত ও পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাথাপিছু অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকার করছাড়ের কথা বলা হয়েছে।

সামাজিক সহায়তা বাড়ানোর অংশ হিসেবে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির অনুদান বর্তমান ৬৫০–৯০০ টাকা থেকে প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং সময়ের সঙ্গে ধরে ধাপে ধাপে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের সম্মানী দিয়ে প্রতিমাসে ইমামদের ৭,৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫,০০০ টাকা ও খাদেমদের ৩,০০০ টাকা দেয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে—১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ বাস্তবায়ন এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে জামায়াতের প্রস্তাব, গর্ভধারণের শুরু থেকেই সকল মায়ের জন্য দুই বছর মেয়াদী বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে এবং প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি আলিয়া মাদ্রাসাকে সরকারি করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বক্তব্যে মিলন পুরনো শাসনকালকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার হয়েছে—প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা—যা ব্যাংক ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। তাঁর ভাষ্যে, সেই সব দায় উন্মোচন ও পাচিত অর্থ ফিরিয়ে এনে বাজেট ঘাটতি মেটানো হবে।

তিনি আরও বলেন, জামায়াতের প্রস্তাবিত বাজেট সম্পূর্ণভাবে প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয়; বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। দলটি স্বচ্ছতা ও ন্যায্য সম্পদবণ্টনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্যে কাজ করতে চায়।

অনুষ্ঠানে মিলনের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে সরকারি বাজেট পাসের আগে জনগণের কাছে তাদের কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ভাবনা তুলে ধরতেই এই বিকল্প ছায়া বাজেট প্রস্ফুটিত করা হয়েছে।