ঢাকা | মঙ্গলবার | ৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৩শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

জামায়াত পেশ করল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ‘জনমুখী ছায়া বাজেট’

বিগত শাসনের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ক্ষত সারিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরেন।

প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আয়তন ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ বলে বলা হয়েছে।

সাইফুল আলম মিলন ফ্যাসিস্ট শাসনামলের সমালোচনা করে বললেন, ওই সময়ে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে এবং ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে বড় পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে — প্রস্তাবনায় উল্লেখিত ২৮ লাখ কোটি টাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এসব অর্থ ফিরে এলেই বাজেট ঘাটতি মিটে যাওয়ার পথে বড় অংশ খালি হবে।

বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। মাদ্রাসা সরকারিকরণেও জোর দিয়ে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রাসা সরকারিকরণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন সেবা প্রসঙ্গে প্রস্তাবটি বলছে, গর্ভধারণের শুরু থেকেই সকল মায়ের জন্য দুই বছর মেয়াদি বিনামূল্যে প্রাথমিক মাতৃ-স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা বর্তমানে যা ৬৫০–৯০০ টাকা থেকে তা প্রথমে ১ হাজার টাকা করে অন্যদিকে ধাপে ধাপে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য বিশেষ ভাতা উঠে এসেছে: দেশের সকল মসজিদের ইমামদের মাসিক ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫ হাজার টাকা এবং খাদেমদের ৩ হাজার টাকা করে সম্মানী প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ট্যাক্স নীতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাবও এসেছে— এনআইডিকেই টিন বা ‘বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর/ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে, যাতে করজাল প্রসারিত করা যায়। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর চালুর কথাও প্রস্তাবে রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান সাড়ে চার লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকায় নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া করদাতাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ হিসেবে বছরে ৫০ হাজার টাকা এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাথাপিছু আরও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কররেয়াতের সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে—১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ রাখা হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাবে সরকারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয় বরং নাগরিককেন্দ্রিক নীতির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অদক্ষতা দূর করে সম্পদ বণ্টনে ন্যায় নিশ্চিত করে একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির কাঠামো গঠনের উদ্দেশ্য জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সাইফুল আলম বলেন, তারা জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের আগে জনগণের কাছে তাদের কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরতেই এই বিকল্প বাজেট নিয়ে আসেছে। তিনি বলেন, আমরা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভিত্তি রেখে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি।