ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ব্রাজিলের ৭-১ ট্র্যাজেডি কি এবার ট্রফিতে বদলে যাবে?

ফুটবলে কিছু সংখ্যা থাকে শুধু পরিসংখ্যানই নয়—স্মৃতি, বেদনা, গৌরব কিংবা অলক্ষ্য চিহ্ন। ব্রাজিলের কাছে ‘৭’ সেই ধরনের একটি সংখ্যা। ২০১৪ সালের মিনেইরাওতে জার্মানির বিরুদ্ধে অভিশাপস্বরূপ ঘটে যাওয়া ৭-১ শুধু এক ম্যাচের স্কোর ছিল না; সেটা পুরো জাতির ফুটবল-অহংকারে স্থায়ী চিহ্ন কাটে।

আজ ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতে মাত্র সাত দিন বাকি। সেই কাঁটা-দারুন স্মৃতি সামনে রেখে প্রশ্ন উঠে—ওই ৭ গোলের ট্র্যাজেডি কি এবার ট্রফিতে রূপ নেবে?

২০১৪ সালের প্রতিফলন ব্রাজিলকে শুধু কাঁদায়নি; তা ভাবতে বাধ্য করেছিল কি করে আধুনিক ফুটবলে টিকে থাকা যায়। সমস্যা ছিল কেবল নেইমারের অনুপস্থিতি বা সতর্কতার ঘাটতি নয়; ছিল দলগত কাঠামো, মানসিক প্রস্তুতি, মাঝমাঠের ভারসাম্যহীনতা এবং চাপ সামলাতে অক্ষমতা। জার্মানি কেবল গোল করেনি—ব্রাজিলীয় ভাবনাচিন্তাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল।

বড় দলগুলোর নতুন করে ভাবার দরকার পড়ে; শুধু ব্যক্তিগত জাদু আর সৌন্দর্য দিয়ে আর বড় টুর্নামেন্ট জেতা যায় না। পজিশনাল শৃঙ্খলা, প্রেসিং থেকে ফিরে দ্রুত পুনরুদ্ধার, একটি মাঝমাঠ যা সৃজনশীলতার সঙ্গে রক্ষণে নিরাপদ—এসবই এখন আফ্রিক-মধ্যপ্রাচ্য-আমেরিকার ময়দানে প্রয়োজনীয়।

এবারকার সেলেসাও দলের প্রধান আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই আক্রমণভাগ। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র একাই ম্যাচের গতিবিধি বদলে দিতে পারেন—বাম মোড় থেকে তার দৌড়, ওয়ান-অন-ওয়ান ক্ষমতা, বক্সে ঢুকে শেষ স্পর্শ দেওয়ার সামর্থ্য দলের জন্য বড় অস্ত্র। রাফিনিয়া ডান পাশ থেকে মেলায় কাট-ইন, লং-রেঞ্জ শট ও সেট-পিস ডেলিভারিতে দলের পালটা দল গঠন করে।

নেইমারের গল্প আলাদা অনুভূতি জাগায়—বয়স, চোট ও ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তার নামই কিছুওরকম মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষের কাছে। এক জরুরি পাস, একটি ফ্রি-কিক বা এক মুহূর্তের জাদু ম্যাচের গতিপথ পাল্টাতে পারে। এই টুর্নামটি হয়তো নেইমারের জন্য বড় মঞ্চে আরেকবার নিজের উত্তরাধিকার প্রমাণের সময়ও হবে।

আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল শুধু আবেগের দল নয়; অভিজ্ঞতা, কৌশল এবং ভারসাম্যের মিশেল—এটি আনচেলত্তির বড় পাওয়া। বিশ্বসেরা ক্লাবগুলোর চাপযুক্ত ড্রেসিংরুমে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে জানিয়েছে কিভাবে তারকাদের পাশাপাশি দলগত কাঠামোও নিয়ে চলতে হয়। বড় টুর্নামেন্টে সেই অভিজ্ঞতা অপরিহার্য হতে পারে।

তবে গত সাত বছরে ব্রাজিল যে উন্নতি করেছে তা শুধুই আক্রমণে সীমাবদ্ধ নয়; আয়তনে দৃঢ় রক্ষণশৈলী ও মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণের উপরে আস্থা বাড়ানো হয়েছে। আনচেলত্তি চাইলে বল ধরে খেলায় ধীরে ধীরে টেম্পো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, আবার কাউন্টার আক্রমণে দ্রুতগতির খেলাও রান করতে পারবেন—এই বহুমাত্রিকতা বড় আড়ম্বর।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে চাপের মুহূর্তগুলোতে ঠান্ডা মাথায় থাকা। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কয়েক মিনিটের ভ্যান্ডার চলে যাওয়াই টুর্নামেন্ট শেষ করে দিতে পারে। ২০১৪ সালের ছয় মিনিটের কালো অধ্যায় ছিল শুধু রক্ষণভাগের ত্রুটি না; সেটা ছিল সামগ্রিক দলগত পতনের প্রতিচ্ছবি। সেজন্য এবার ব্রাজিলকে দরকার আক্রমণের উন্মাদনাকে রক্ষণভাগের শীতল মজ্জাবৃন্তের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া।

সমর্থকদের কাছে এই দল দুটি লড়াই করবে—ম্যাচে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এবং স্মৃতির বিরুদ্ধে। জার্মানির সেই সাত গোল আর মুছে যাবে না; কিন্তু নতুন ট্রফি পুরোনো ক্ষতকে অন্য অর্থ দেয়। যদি সেলেসাও এবারের বিশ্বকাপে সেরা হয়, তাহলে ৭-১ শুধু অপমানের প্রতীক থাকবে না; হয়ে উঠবে পুনর্জাগরণের সূচনা।

শেষ দিকে যে চিন্তা ফিরে আসে: ব্রাজিলের আক্রমণের প্রতিটি দ্রুত দৌড়, নেইমারের একটুখানি জাদু, ভিনিসিয়ুসের বিস্ফোরণ—এসব কি মিলিয়ে তারা পুরনো দুঃস্বপ্নকে ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্নে পরিণত করতে পারবে? উত্তর পেতে আর মাত্র সাত দিন বাকি।