ঢাকা | বুধবার | ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

রাত পোহালেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট, সারা দেশের নজর

রাত পোহালেই শুরু হচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। প্রথম দফার ভোটগ্রহণ আগামী বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাজ্যের ১৬টি জেলায় ১৫২টি আসনে অনুষ্ঠিত হবে। বাকি ৮ জেলার ১৪২টি আসনে দ্বিতীয় দফার ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। এই প্রতিযোগিতা কেউ মনে করছে ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই, কেউ বলছে এটা ক্ষমতা দখলের যুদ্ধে পরিণত হবে, আবার অনেকেই এটিকে প্রতিষ্ঠার লড়াই বলছেন। তাই পুরো দেশের দৃষ্টি এখন পশ্চিমবঙ্গে।

নির্বাচনের ফল কখনোই একক ইস্যু বা একক জোড়ার উপর নির্ভর করে না। প্রার্থী, ইস্যু, সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটারের অনুভব—এসবের জটিল সমাহার দিয়ে ফল নির্ধারিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের এই সমীকরণে কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তি বিশেষ ভূমিকা নিচ্ছেন। তারা কেউ সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী, কেউ সিদ্ধান্ত-গ্রহণে প্রভাবশালী ও কেউ আবার রাজ্যের বাইরে থেকে হলেও ভোটের পাখির চোখ হিসেবে বিবেচিত।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তৃণমূল নেতারা প্রায়ই ‘রাজ্যের ২৯৪টি আসনে একমাত্র ভোটার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের পর রাজ্যের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতায় এসে তিনি এখনও ধরে রেখেছেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, জনসংযোগ ও সংগ্রামী প্রতিচ্ছবি তৃণমূলের সবচেয়ে বড় শঙ্খস্বরূপ।

তবে গত কয়েক বছরে তার দলের কিছু নেতা-মন্ত্রীকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তৃণমূলের জন্য পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হয়েছে। শিক্ষা ও পৌরসেবা সংক্রান্ত নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ, রেশন দুর্নীতি এবং বিভিন্ন অনৈতিক ঘটনার খবর জনমানসে ক্ষোভ তৈরি করেছে। এসব বিষয় বিরোধীদের নির্বাচনী আক্রমণের প্রধান হাতিয়ার। তবু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, যুবসাথী ইত্যাদি সামাজিক ও কল্যাণমূলক প্রকল্প ভোটে তৃণমূলের পক্ষে প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষত নারী ও মুসলিম ভোটারের মধ্যে।

নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ জুটি

বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গকে ‘পাখির চোখ’ করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার রাজ্যে এসে জনসভা ও র‍্যালি করে কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নকাহিনি প্রচার করেছেন। মোদির কাছে সমর্থন টানার ওপর বিজেপি নির্ভর করছে; আর অমিত শাহকে দেখা হচ্ছে দলীয় কৌশল রচনায় প্রধান হাত হিসেবে।

বিজেপি তৃণমূলকে দুর্নীতি, অনুপ্রবেশ ও প্রশাসনিক অসামঞ্জস্যের দায়ে আক্রমণ করেছে এবং দাবি করেছে যে কেন্দ্রীয় উন্নয়ন সুবিধার সুবিধে রাজ্যের নাগরিকদের ঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়নি। গত কয়েক বছরে রাজ্যে বিজেপির সংগঠন দৃঢ়তর হলেও মোদিকে সামনে রেখে এখানে বড় স্বরলিপি তৈরি করে জেতা কতটুকু সম্ভব হবে—সেটা নির্বাচনবিজ্ঞদের নজরকাড়ার বড় প্রশ্ন।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যদিও বিধানসভায় প্রতিদ্বন্দ্বী নন, তবু দলের অভ্যন্তরীণ রণকৌশল ও সাংগঠনিক কাজের অনেকটাই তার হাতে-কলমে চলে। ‘বয় নেক্সট ডোর’ ইমেজ ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতিপূর্ণ মুখ হিসেবে তুলে ধরেছে। বিপক্ষের অভিযোগ—দুর্নীতি বা পারিবারিক প্রভাব—এই ইস্যুগুলো দলের সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

শুভেন্দু অধিকারী

একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ তৎপর, পরবর্তীকালে বিজেপিতে যোগ দেওয়া শুভেন্দু অধিকারী এখন রাজ্যের বিরোধী শক্তির প্রধান মুখের মধ্যে একজন। নন্দীগ্রাম থেকেই তার জনগণগত প্রভাব রয়েছে এবং বিজেপি তাকে দিয়েই নন্দীগ্রাম ও অন্যান্য এলাকায় শক্তি প্রদর্শন করতে চায়। তৃণমূল এবং অন্যান্য বিরোধীরা তাকে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করার অভিযোগে লক্ষ্য করছেন, আর ভোটার তালিকা ও এসআইআর-সংক্রান্ত বিতর্কও তাঁর আশপাশে নির্বাচনী জটিলতা বাড়িয়েছে।

হুমায়ুন কবীর

পূর্বে কংগ্রেস, পরে বিজেপি ও তৃণমূল—সবাইতে কিছু সময় করে যাওয়া হুমায়ুন কবীর শেষমেষ ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ নামে নিজস্ব দল গড়েছেন। মুর্শিদাবাদে মসজিদ নির্মাণ সংক্রান্ত ঘোষণাসহ宗ীয় ইস্যু কেন্দ্র করে তিনি আবারো আলোচনায় এসেছেন। কবীরের দলের প্রভাব প্রধানত দক্ষিণবঙ্গের নির্দিষ্ট অঞ্চলে আছে; মুসলিম ভোটের ভাগাভাগি এখানে ফল নির্ধারণে গুরুত্ব বহন করতে পারে। তাঁর গতিবিধি ও পার্টি বদলের ইতিহাস বিবেচনায় বিরোধীরা ও সমালোচকরা তাঁকে নানা অভিযোগে তুলছেন।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য ভোটপ্রভাব

তৃণমূলের পক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত কেরিশমা ও দলের কল্যাণমূলক প্রকল্প শক্ত লাভদায়ক ফ্যাক্টর। অন্যদিকে দুর্নীতি, নিয়োগ কেলেঙ্কারি, বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনাসহ প্রশাসনিক অভিযোজনগুলি দলকে অসুবিধায় ফেলতে পারে। বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব—মোদি ও শাহ—যদি রাজ্যের ভোটমঞ্চে শক্তি প্রদর্শন করতে পারেন, তাহলে সেটিও তাদের পক্ষে বড় প্লাস পয়েন্ট হবে।

রাজ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রবীণ সাংবাদিকরা বলছেন, ‘‘মমতা তৃণমূলের অচলাপ্রাচীন নেতা; অন্যদিকে মোদি-শাহ জুটি বিজেপির আখরোশ। শুভেন্দু, অভিষেক ও হুমায়ুন কবীর—এরা প্রত্যেকেই নির্বাচনকে ভিন্ন রূপ দিতে পারে।’’ শিখা মুখার্জী উল্লেখ করেছেন যে অভিষেক দলের সংগঠন মজবুত করতে ভূমিকা রেখেছেন, আর শুভেন্দু স্থানীয় স্তরে শক্তিজমা করে রেখেছেন। হুমায়ুন কবীরকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন না—কারণ তার দল ও অবস্থান অনিশ্চিত মনে করেন অনেকে।

উজ্জ্বল রায় আরও বলেন, ‘‘মোদি-শাহের উপস্থিতি সবসময় নির্বাচনে গুরুত্ব বাড়ায়, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেই কৌশল সব সময় ফল দেয় না। এসআইআর-সহ সমসাময়িক ইস্যু ভোটকে প্রভাবিত করতে পারে।’’

শেষ কথায়, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন কৌতূহল, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আবেগ—all মিলিয়ে তৈরি করছে একটি তীব্র রাজনীতিক ময়দান। ভোটের পলকে যা ঘটবে, সেটা শুধু রাজ্যের ভবিষ্যতই নয়—কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক ও জাতীয় রাজনীতিক খাঁজেও প্রভাব ফেলতে পারে।