ঢাকা | সোমবার | ১৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৩০শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

সরকারের এডিপির বরাদ্দে কমতি, সংশোধিত অনুমোদন হলো ২ লাখ কোটি টাকা

চলতি অর্থবছরের জন্য সরকারের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় (এডিপি) বরাদ্দের পরিমাণ কমে গেছে। আগে যা ছিল বেশি, এখন তা হ্রাস পেয়ে মোট ২ লাখ কোটি টাকা মাত্রে এসে দাঁড়িয়েছে। এই ঘোষণা আজ সোমবার শেরেবাংলা নগরে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) সম্মেলনকক্ষে বৈঠকের মাধ্যমে জানানো হয়।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এবং এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পরিকল্পনা কমিশনের উপদেষ্টা ও বৈঠকের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উল্লেখ করেন, এডিপির আনুমানিক বরাদ্দ থেকেই প্রায় ১৩ শতাংশ ছাটাই করে সংশোধিত পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানান, বাজেটের এই সংশোধনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চলতি বছর প্রকল্পের বাস্তবায়নের ধীরগতি। অনেক প্রকল্পের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প পরিচালক না থাকা, নিয়োগে বিলম্ব এবং কিছু প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন চলছে—এসব কারণে প্রকল্পের ব্যয় কমানোর অনুরোধ জমা পড়ে।

সংশোধিত এডিপিতে সরকারি অনুদান ও বিদেশি ঋণ—দুই ক্ষেত্রেই বরাদ্দ কমে গেছে। সরকারি অর্থায়নে ১৬ হাজার কোটি টাকা কাটা হয়েছে, যা প্রায় ১১ শতাংশের মতো, এবং বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে কমানো হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় ১৬ শতাংশের বেশি। ফলে সরকারি অর্থায়ন এখন ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি অর্থ godার পরিমাণ কমে হয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকা।

খাত ভিত্তিক বরাদ্দগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির এক পঞ্চমাংশ। এরপর রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যেখানে বরাদ্দ হয়েছে ২৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। শিক্ষাখাত, বাসস্থান ও কমিউনিটি উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ হয়েছে।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্যখাতে হঠাৎ করে বেশ ধাক্কা লেগেছে। এই খাতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন সক্ষমতা দুর্বল থাকায় বরাদ্দ প্রায় ৭৪ শতাংশ কমে গেছে। মূল এডিপিতে যেখানে স্বাস্থ্যসচিব বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, সেখানে সংশোধনীতে তা নেমে এসে হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। একইভাবে শিক্ষাখাতেও বড় কাটা হয়েছে, যেখানে বরাদ্দ প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ থাকা পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের বরাদ্দও সংশোধিত এডিপিতে প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি, সামাজিক সুরক্ষা খাতে, যেখানে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৮ কোটি টাকা, সেখানে এখন বরাদ্দ মাত্র ৫৪৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে বরাদ্দও প্রায় ১৯ ও ২১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সম্পদ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দে স্থানীয় সরকার বিভাগ পেয়েছে সর্বোচ্চ অর্থ, মোট ৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, যা মূল এডিপির তুলনায় কিছুটা কম। এর পাশাপাশি রয়েছে সড়ক পরিবহন, মহাসড়ক, পানি সম্পদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অন্যান্য বিভাগ। উল্লেখ্য, বরাদ্দের মধ্যে বিশেষ উন্নয়নের জন্য আলাদা প্রকল্পও সংযুক্ত হয়েছে।

সব মিলিয়ে, সংশোধিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ৩৩০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই বিনিয়োগ প্রকল্প। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, এই অর্থবছরে এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে ২৮৬টি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যেখানে টাকা কম হলেও কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ধীর গতি দ্রুততার পথে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।